সংস্কৃত
ভাষার ইতিহাস
সংস্কৃত
ভাষা একটি অতি প্রাচীন ভারতীয়
ভাষা। এই ভাষা বহুকাল ধরে
ভারতীয় সংস্কৃতির ধারক এবং
বাহক। এই ভাষাই বারেবারে
ভারতীয় সংস্কৃতিকে অমৃতাস্বাদ
প্রদান করে চলেছে।
সংস্কৃত(संस्कृतम् সংস্কৃতম্,
সঠিক
নাম: संस्कृता
वाक्, সংস্কৃতা
বাক্,
পরবর্তীকালে
প্রচলিত অপর নাম: संस्कृतभाषाসংস্কৃতভাষা,
"পরিমার্জিত
ভাষা")
হল
একটি ঐতিহাসিক ইন্দো-ইউরোপীয়
ভাষা এবং হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মের পবিত্র
দেবভাষা।
বর্তমানে
সংস্কৃত ভারতের ২২টি
সরকারি ভাষার অন্যতম
এবং উত্তরাখণ্ড রাজ্যের
অন্যতম সরকারি ভাষা।
ধ্রুপদি
সংস্কৃত এই
ভাষার প্রামাণ্য ভাষাপ্রকার।
খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে
রচিত পাণিনির ব্যাকরণে এই
প্রামাণ্যরূপটি
প্রতিষ্ঠিত হয়। ইউরোপে লাতিন বা প্রাচীন
গ্রিক ভাষার যে
স্থান, বৃহত্তর
ভারতের সংস্কৃতিতে
সংস্কৃত ভাষার সেই স্থান।ভারতীয়
উপমহাদেশ,
প্রাচীনতম
রূপ। এর সর্বাপেক্ষা প্রাচীন
নিদর্শনটি খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০
অব্দ নাগাদ রচিত।
এই
কারণে ঋগ্বৈদিক
সংস্কৃত
সাহিত্যের ভাণ্ডার
কাব্য ও নাটকের ঐতিহ্যশালী
ধারাদুটি ছাড়াও বৈজ্ঞানিক,
কারিগরি, দার্শনিক ও হিন্দু
শাস্ত্রীয় রচনায় সমৃদ্ধ।
হিন্দুদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে
সংস্কৃত হল আনুষ্ঠানিক
ভাষা।
এই ধর্মে স্তোত্র ও মন্ত্র
সবই সংস্কৃতে লিখিত। কয়েকটি
ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে আজও
কথ্য
সংস্কৃতের
ব্যবহার প্রচলিত রয়েছে এবং
সংস্কৃত ভাষাকেপুনরুজ্জীবিত করার
নানা প্রচেষ্টাও করা হয়ে
থাকে।
সংস্কৃত
ক্রিয়া বিশেষণ সংস্কৃত- কথাটির
আক্ষরিক অর্থ "সংযুক্ত
করা",
"উন্নত
ও সম্পূর্ণ আকারপ্রাপ্ত",
"পরিমার্জিত"
বা
"সুপ্রসারিত"।
শব্দটি সংস্কার ধাতু
থেকে উৎসারিত;
যার
অর্থ "সংযুক্ত
করা,
রচনা
করা,
ব্যবস্থাপনা
করা ও প্রস্তুত করা"।
সং শব্দের
অর্থ "সমরূপ"
এবং
"(স্)কার"
শব্দের
অর্থ "প্রস্তুত
করা"।
এই
ভাষাটিকে সংস্কৃত বা পরিমার্জিত
ভাষা মনে
করা হয়। এই কারণে এই ভাষা
একটি "পবিত্র"
ও
"অভিজাত"
শিল্পগুণবর্জিত,
স্বাভাবিক
ও সাধারণ")
ভাষার
পরিবর্তে এই ভাষা ব্যবহৃত
হত। এই ভাষাকে "দেবভাষা"
বলা
হত;
কারণ
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী
এই ভাষা ছিল "দেবগণ
ও উপদেবতাগণের ভাষা"।
সংস্কৃত ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাপরিবারের ইন্দো-ইরানীয় উপপরিবারের
সদস্য। এই ভাষার নিকটতম প্রাচীন
আত্মীয় হল ইরানীয় আদি
পারসিক ও আবেস্তান ভাষাদুটি।
বৃহত্তর
ইন্দো-ইউরোপীয়
ভাষাপরিবারে সংস্কৃত ভাষার
ধ্বনিপরিবর্তন বৈশিষ্ট্যগুলি সাতেম ভাষাসমূহ
(বিশেষত স্লাভিক ওবাল্টিক
ভাষা)
এবং গ্রিক
ভাষার অনুরূপ।
সংস্কৃত
ও অন্যান্য ইন্দো-ইউরোপীয়
ভাষার সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলি
আলোচনা করতে গিয়ে গবেষকগণ
পরিণত
হয়েছে,
তার
আদি ভাষাভাষীগণ খ্রিষ্টপূর্ব
দ্বিতীয় সহস্রাব্দের প্রথম
ভাগে উত্তর-পশ্চিম
সীমান্ত পথে ভারতীয় উপমহাদেশে
প্রবেশ করে।
এই
তত্ত্বের প্রমাণস্বরূপ বাল্টিক
ও স্লাভিক ভাষার সঙ্গে
ইন্দো-ইরানীয়
ভাষার ঘনিষ্ট সম্পর্ক,
অ-ইন্দো-ইউরোপীয় ফিনো-আগরিক
ভাষাসমূহের সঙ্গে
শব্দভাণ্ডার
আদানপ্রদান,
এবং
উদ্ভিদ ও জীবজগতের নামসংক্রান্ত
ইন্দো-ইউরোপীয়
প্রামাণ্য শব্দগুলিকে তুলে
ধরা হয়।
সংস্কৃত
ভাষায় রচিত প্রাচীনতম প্রামাণ্য
রচনা হল হিন্দু ধর্মগ্রন্থ ঋগ্বেদ।
খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয়
সহস্রাব্দের মধ্য থেকে শেষ
ভাগের মধ্যবর্তী সময়ে এই
গ্রন্থ রচিত হয়। এই সময়কার
কোনো লিখিত নথি পাওয়া যায়
না। যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে,
এই
গ্রন্থের মৌখিক প্রচলনটি
বিশ্বাসযোগ্য। কারণ,
এই
জাতীয় গ্রন্থগুলির সঠিক
উচ্চারণকে ধর্মীয় কারণেই
গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হত।
ঋগ্বেদ
থেকে পাণিনি (খ্রিষ্টপূর্ব
চতুর্থ শতাব্দী)
পর্যন্ত
সংস্কৃত ভাষার বিকাশ লক্ষিত
হয় সামবেদ, যজুর্বেদ, অথর্ববেদ, ব্রাহ্মণ ও উপনিষদ গ্রন্থগুলিতে।
এই সময় থেকে এই ভাষার মর্যাদা,
ধর্মীয়
ক্ষেত্রে এর ব্যবহার,
এবং
এর সঠিক উচ্চারণ সংক্রান্ত
বিধিনিষেধগুলি এই ভাষার
বিবর্তনের পথে বাধা হয়ে
দাঁড়ায়।[১৪]
পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী প্রাচীনতম
সংস্কৃত ব্যাকরণ,
যা
আজও বর্তমান রয়েছে। এটি মূলত
একটি প্রামাণ্য ব্যাকরণ। এটি
বর্ণনামূলক নয়,
নির্দেশমূলক
প্রামাণ্য গ্রন্থ। যদিও
পাণিনির সময় বেদের কয়েকটি
অচলিত হয়ে পড়া কয়েকটি
বাক্যবন্ধের বর্ণনাও এখানে
রয়েছে।
"সংস্কৃত"
শব্দটির
দ্বারা অন্যান্য ভাষা থেকে
পৃথক একটি ভাষাকে বোঝাত না,
বরং
বোঝাত একটি পরিমার্জিত
কথনরীতিকে। প্রাচীন ভারতে
সংস্কৃত শিক্ষার মাধ্যমে
শিক্ষিত উচ্চসমাজে স্থান
পাওয়া যেত। সাধারণত উচ্চবর্ণের
মধ্যেই পাণিনির ব্যাকরণ তথা
সংস্কৃত ভাষার চর্চা প্রচলিত
ছিল। প্রাচীন ভারতে সংস্কৃত
ছিল বিদ্যাচর্চার ভাষা।
লোকসাধারণে প্রচলিত প্রাকৃত ভাষার
সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতও সমাজে
প্রচলিত ছিল। উল্লেখ্য কথ্য
প্রাকৃত ভাষা থেকেই পরবর্তীকালের
আধুনিক ইন্দো-ইউরোপীয়
ভাষাগুলির উৎপত্তি হয়।
বৈদিক সংস্কৃত
পাণিনি
কর্তৃক সংজ্ঞায়িত সংস্কৃত
পূর্ববর্তী বৈদিক রূপটি থেকে
উৎসারিত। বিশেষজ্ঞদের মতে,
বৈদিক
সংস্কৃত এবং ধ্রুপদি বা
"পাণিনীয়"
সংস্কৃত
সংস্কৃত ভাষার দুটি উপভাষা।
এই দুই উপভাষার মধ্যে সাদৃশ্য
প্রচুর।
কেবল ধ্বনিতত্ত্ব, শব্দভাণ্ডার, ব্যাকরণ ও বাক্যতত্ত্বের ক্ষেত্রে
দুই ভাষার মধ্যে কিছু পার্থক্য
বিদ্যমান। সংস্কৃত বেদের ভাষা
বেদের মন্ত্রভাগ সংহিতা,
গদ্যভাগব্রাহ্মণ ও উপনিষদ বৈদিক
সংস্কৃতে রচিত। এই সকল গ্রন্থ
হিন্দুধর্মের আদি ধর্মগ্রন্থ।
গবেষকগণ মনে করেন,
ঋগ্বেদ
সংহিতার ছন্দময় স্তোত্রগুলি
এই ভাষার প্রাচীনতম রচনা
নিদর্শন। শতাব্দীর পর শতাব্দী
ধরে শ্রুতি পরম্পরায় এই
স্তোত্রগুলি রচিত ও স্মরিত
হয়েছে। বৈদিক যুগের শেষভাগে
উপনিষদ রচিত হয়। খ্রিষ্টপূর্ব
প্রথম সহস্রাব্দের মধ্যভাগে
বৈদিক সংস্কৃত ধর্মীয় ও
শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রথম ভাষা
থেকে দ্বিতীয় ভাষায় পরিণত
হয়। এর ফলে সংস্কৃত ভাষায়
ধ্রুপদি যুগের সূচনা ঘটে।
ধ্রুপদি সংস্কৃত
প্রায়
২০০০ বছর ধরে একটি সাংস্কৃতিক
প্রবাহ দক্ষিণ
এশিয়া, অন্তঃ
এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়া ও পূর্ব
এশিয়ার কিয়দংশকে
প্রভাবিত করে।[১৫] বেদোত্তর
সংস্কৃত ভাষার প্রধান রূপটি
পরিলক্ষিত হয় হিন্দু
মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারতে।
এই দুই মহাকাব্যে পাণিনির
ব্যাকরণ থেকে যে চ্যূতি লক্ষিত
হয়,
তার
কারণ প্রাক-পাণিনীয়
প্রভাব নয়,
বরং
প্রাকৃত প্রভাব।[১৬] প্রাচীন
সংস্কৃত পণ্ডিতগণ এই চ্যূতিকে
বলেছেন আর্ষ (आर्ष)
বা ঋষির দ্বারা
উক্ত।
কোথাও কোথাও একে ধ্রুপদি
সংস্কৃত না বলে প্রাকৃতবাদ বলা
হয়েছে। বৌদ্ধ
সংকর সংস্কৃত হল
একটি মধ্য
ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা,
যা
বিভিন্ন দিক থেকে ধ্রুপদি
সংস্কৃত ভাষার অনুরূপ প্রাকৃত ভাষায়
লেখা বৌদ্ধদের আদি ধর্মগ্রন্থগুলি
রচনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত
হয়।[১৭]
তিওয়ারির
(১৯৫৫)
মতে,
ধ্রুপদি
সংস্কৃতের চারটি প্রধান উপভাষা
ছিল: পশ্চিমোত্তরী (উত্তর-পশ্চিম,
উত্তর
বা পশ্চিম নামেও পরিচিত
ছিল), মধ্যদেশী (মধ্য
অঞ্চল), পূর্বী (পূর্বাঞ্চল)
ওদক্ষিণী (দক্ষিণাঞ্চল,
ধ্রুপদি
যুগে উদ্ভুত)।
প্রথম তিনটি উপভাষার উৎস
বৈদিক ব্রাহ্মণ।
এগুলির মধ্যে প্রথমটিকে
শুদ্ধতম মনে করা হয়। (কৌষিতকী
ব্রাহ্মণ,
৬.৭)।
সংস্কৃত সাহিত্য সূচিত হয় বেদ রচনার মাধ্যমে। পরবর্তী কালে লৌহযুগীয় ভারতে রচিত সংস্কৃত মহাকাব্য ও ধ্রুপদী সংস্কৃত সাহিত্যের সুবর্ণযুগ থেকে আদি মধ্যযুগ (মোটামুটি খ্রিষ্টীয় তৃতীয় থেকে অষ্টম শতাব্দী) পর্যন্ত চরম উৎকর্ষ লাভ করে। ১১০০ খ্রিস্টাব্দে অবক্ষয় যুগ শুরু হওয়ার পূর্বেও একাদশ শতকে এই সাহিত্য আর একবার বিকশিত হয়ে ওঠে। বর্তমান কালে সংস্কৃত পুনরুদ্ধারের যে চেষ্টা চলছে তার অঙ্গ হিসেবে ২০০২ সাল থেকে সর্বভারতীয় সংস্কৃত উৎসব চালু হয়েছে। এই উৎসবের লক্ষ্য সংস্কৃত সাহিত্যকে উৎসাহ দান করা।
হিন্দুধর্মের প্রধান গ্রন্থগুলি সবই সংস্কৃতে লেখা। ভারতের আধুনিক ভাষাগুলিও হয় সংস্কৃত থেকে উৎপন্ন অথবা সংস্কৃত দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। এই কারণে ভারতীয় সংস্কৃতিতেও সংস্কৃত সাহিত্যের প্রভাব অত্যন্ত গভীর।
No comments:
Post a Comment